ডেঙ্গুর প্রকোপ যেন কমছেই না। গত এক মাসের ব্যবধানে দেশে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে চারগুণেরও বেশি। একই সাথে ১৩ গুণ বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা। বৃষ্টির পাশাপাশি গরম আবহাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এর প্রভাব দ্বিগুণ হারে বাড়ার শঙ্কা ।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত মে মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭১৪ জন রোগী । সেখানে শুধুমাত্র জুন মাসেই ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৩ হাজার রোগী। এছাড়া, মৃত্যুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩গুণ। মে মাসে যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র একজন, সেখানে জুনে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে। যা সামনের দিনগুলোর জন্য ভয়াবহতার ইঙ্গিত বহন করে।
জানা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ১০৪ জন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন এবং জুন মাসে দুই হাজার ৯০৭ জন। অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় জুন মাসে ৪ গুণেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রন্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবছর দেশের ৫৬ জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা, ফরিদপুর, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মাদারিপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদাহ, মাগুরা, নড়াইল, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুণা, ঝালকাঠি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার। এর মধ্যে অন্তত ২৭ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ ও মশা গবেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বৃষ্টির পাশাপাশি গরম আবহাওয়া বিরাজ করছে প্রকৃতিতে। এই অবস্থায় ডেঙ্গুর প্রজনন বাড়ে। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়বে। তিনি আরো বলেন, এবার ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। ডেঙ্গুর প্রজননের অনেক উৎস পাওয়া গেছে। কিছু জেলায় আমরা লার্ভার ঘনত্ব বেশি পেয়েছি। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমরা একটি জরিপ চালিয়েছি, সেখানে কোথাও কোথাও ঘনত্ব অনেক বেশি।
তিনি জানান, রাজধানীতে সরকারের মশা নিয়ন্ত্রণের কাঠামো থাকলেও ঢাকার বাইরে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। এই বিষয়ে সরকারকে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। না হলে ঢাকার বাইরের মানুষকে চরম খেসারত দিতে হবে।
এ ব্যাপারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি এবং কীটতত্ত্ববিদ ড. জিএম সাইফুর রহমান বলেন, রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কাজ করা হচ্ছে। যদিও এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে চলছে কার্যক্রম। তারপরও সংস্থার আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা বেড়েছে বলে মনে হয়। এটা ধরে রেখে কীটতত্ত্ববিদদের দিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির যথাযথ অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তাহলে সামনের দিনগুলোতে ঢাকার এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে অনেকাংশে সফলতা আসবে। একই সঙ্গে নগরবাসীকে সচেতন করে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে।
তিনি জানান, ঢাকার পাশাপাশি এডিস ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। কিন্তু সেখানে ঢাকার মতো মশা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নেই। এজন্য সেখানকার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে তা আরও ভয়াবহ হতে পারে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।