
দেশজুড়ে টানা বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশের ১৯টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করায় দেশের সব সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন আজকের (বুধবার) এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ ও আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা জোরদার করেছে প্রশাসন।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়েছে। এরই মধ্যে বুধবার কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মসজিদুল কুবা মহিলা মাদরাসা ও হেফজখানায় পাহাড়ধসের ঘটনায় ৮ শিশু নিহত হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১৪ জনকে।
উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে নিরাপদে চলাচল করতে হবে এবং গভীর সাগরে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে অস্থায়ীভাবে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। নদীবন্দরগুলোকে এক নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে এবং নৌযানগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের ১৯টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিরও সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে এক নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িকে ঘিরে। বান্দরবানে পাহাড়ি ঢল নেমে কয়েকটি ছড়ার পানি বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করছে জেলা প্রশাসন। অতীতের মতো বড় ধরনের ভূমিধসের আশঙ্কায় বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে পানি জমে গেছে। পাহাড়ি সড়কে যানবাহন চলাচলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়িতেও পাহাড়ি ছড়াগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
টানা বর্ষণে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। শহরের নিচু এলাকায় পানি জমে জনজীবন দুর্ভোগে পড়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি ঢালসংলগ্ন এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে। পাহাড় কেটে তৈরি অনেক বসতি ভারী বর্ষণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ক্যাম্পগুলোতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক, উদ্ধার সরঞ্জাম ও জরুরি সেবা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্যজীবীদের গভীর সাগরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে টানা বর্ষণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। কোথাও কোথাও সড়কে পানি জমে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি তিনটি ফ্লাইট। রেললাইনের কিছু অংশে পানি ওঠা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হবে।
পাহাড়তলী বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা বলেন, রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে অবস্থান করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ট্র্যাক নিরাপদ ঘোষণা করা হলে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হবে।
একই কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আজ বুধবার (৮ জুলাই) অনুষ্ঠিতব্য সব এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বন্যার পূর্বাভাসের বিষয়টি বোর্ডের নজরে রয়েছে। কোনো জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে ওই এলাকার এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বোর্ড জানিয়েছে, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রের কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
টানা বর্ষণে দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলা সদরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ায় আমন চাষসহ মৌসুমি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে দূরে থাকা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অববাহিকার নদ-নদীর পানি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীর পানিও বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে এবং সব নদী বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ দিনে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রথম তিন দিন পানি স্থিতিশীল থাকলেও শেষ দুই দিনে বৃদ্ধি পেতে পারে।
সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি কমলেও কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে সতর্কসীমায় রয়েছে। আগামী তিন দিনে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে এক দিন স্থিতিশীল থাকার পর নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদী নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী তিন দিনে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ অঞ্চলের জিঞ্জিরাম, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানি আগামী তিন দিনে দ্রুত বাড়তে পারে। অন্যদিকে ঢাকা অঞ্চলের তুরাগ, টঙ্গীখাল, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা ও বালু নদীর পানি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদীগুলো কিছু স্থানে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক প্লাবন দেখা দিতে পারে।
এদিকে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গোমতী, মুহুরি, সেলোনিয়া ও ফেনী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কক্সবাজার, ফেনী ও চট্টগ্রামের কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
এ ছাড়া হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানিও দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় এসব নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।